ধাপে ধাপে ওযুর নিয়ম ও ওযুর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞানে ওযুর গুরুত্ব, ওযুর ফরজ কি কি, ওযুর সুন্নত ও আদব কি কি, ধাপে ধাপে ওযু করার নিয়ম, ওযু ভঙ্গের কারণসমূহ এবং ওযু করার সময় সাধারণত কি কি ভুল হয়ে থাকে, তা সহজ ভাষায় এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

ইসলামে ওযুর গুরুত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞান

ইসলামে পরিচ্ছন্নতা হল ইমানের অঙ্গ।পরিচ্ছন্নতা ইসলামের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা অন্য কোন ধর্মে দেখা যায় না।ইসলামে পরিচ্ছন্ন হওয়ার একটি উৎকৃষ্ঠ পন্থা হল ওযু।ওযু ছাড়া নামাজ হয় না।ওযু দ্বারা ওই সব স্থানই পরিষ্কার হয়,যে সব স্থান দিয়ে শরীরে রোগ জীবানু প্রবেশ করে।অর্থাৎ,ওযু হল রোগব্যাধির প্রবেশ দ্বারের অতন্ত্র প্রহরী।

ওযু ও আধুনিক  বিজ্ঞান

ওযুতে অনেক গুলো নিয়ম রয়েছে যার দ্বারা মানুষ পবিত্র হয়।

হাত ধৌত করাঃ 

হাত আমাদের শরীরের অতিব জরুরি একটি অঙ্গ।আমরা হাত দিয়ে সারাদিন অনেক কাজ করে থাকি।আবার হাত দিয়ে খাবার ও খাই।তাই আধুনিক বিজ্ঞান মতে হাত ধৌত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।কারন হাতের মাধ্যমে জীবানু আমাদের মুখে প্রবেশ করে শরীরে ছড়িয়ে যায় যা অনেক রোগের সৃষ্টি করে । হাতের মাধ্যমে যে সব রোগ ছড়ায়ঃ ক) চর্মরোগ খ)পেটের অসুখ গ)ফাঙ্গাস (ইত্যাদি)

এখানে মজার ব্যপার হল আরো চৌদ্দশত বছর আগেই ইসলাম ওযুর মাধ্যমে হাত ধৌত করা বাধ্যতা মূলক করে। একজন মুসলমান অন্তত দিনে পাঁচ বার ওযু করে। তার মধ্যে প্রত্যেক ওযু তে (৩,৫,৭)বার ও হাত ধোয়ার নিয়ম রয়েছে। যদি ওযুতে তিন বার হাত ধোয়ার নিয়ম ধরা হয় তাহলে একজন মানুষ প্রতিদিন ১৫ বার হাত ধৈত করবে।যা আমাদের শরীর জন্য অত্যন্ত জরুরি।

কুলি করাঃ 

কুলি করা হলো ওযুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। আমরা যখন খাবার গ্রহন করি তখন সেগুলো অনেক সময় দাঁতে আটকে থাকে। যার ফলে মুখ দুর্গন্ধ হয় এবং এর থেকে দাঁতে পোকা,মুখে ক্যান্সার ও হতে পারে যা একজন মানুষের মুখের সুন্দরর্য নষ্ট করে,মুখের ক্যান্সারের ফলে খাবার খেতে না পেরে মানুষ সক্রিয়তা হারায় এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকতে পারে।একজন মানুষ যদি দিনে পাঁচ বার নিয়ম মাফিক ওযু করে তবে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

নাকে পানি দেওয়াঃ 

শ্বাস গ্রহণের একমাত্র পথ হল নাক।আর যে বাতাস থেকে শ্বাস গ্রহণ করা হয় তার মধ্যে লালিত-পালিত হয় অসংখ্য রোগজীবানু যা নাকের ভিতর দিয়ে অতি সহজেই মানব দেহে প্রবেশ করে। সুতরাং রোগ জীবাণু ধুলোবালি শ্বাসের সাহায্যে সব সময় নাকে প্রবেশ করছে। এভাবে যদি সকাল সন্ধ্যা এসকল রোগজীবানু নাকের মাধ্যমে শরীরে ঢুকতে থাকে তাহলে বিপদজনক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।তাই দৈনন্দিন ৫ বার ওযুর মাধ্যমে নাক পরিষ্কার করলে নাকের মাধ্যমে শরীরে রোগজীবাণু লালিত-পালিত হওয়া সম্ভব নয় যা আমাদের কঠিন রোগ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।

মুখ ধৌত করাঃ 

নিয়মিত মুখ ধৌত করলে মুখের সৌন্দর্য ঠিক থাকে। মুখে বাতাসের ধুলো বালির জীবানু থেকে ব্রণ ও বিভিন্ন সমস্যা হয়। ৫ বার ওযুর মাধ্যমে মুখ পরিষ্কার থাকে এতে কোন ফেসওয়াসের দরকার হয় না। যা আমাদের মুখমন্ডলের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।

আমরা ওযুর মাধ্যমে মুখ ধৌত করার সময় তিন বার মুখ ম্যাসাজ করি। যার জন্য ক্যামিকেলের দরকার হয় না।

আমরা যখন মুখে পানি দেই তখন আমাদের ভ্রুতে পানি জমে থাকে। মেডিকেল বা স্বাস্থ্য সংস্থার মূলনীতি অনুযায়ী ভ্রুতে আদ্রতা থাকলে চোখের পানি শূণ্যতা রোগ থেকে রক্ষা পায়।

কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করাঃ

 কনুই শরীরের একটি আবৃত অঙ্গ।যা বেশীর ভাগ সময় আবৃত থাকে।এতে যদি বাতাস না লাগে তবে মতিস্ক ও স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া কনুই হৃদপিন্ড,মস্তিষ্ক ও যকৃতের সাথে তিন প্রকার বৃহৎ শিরা থাকে। কনুই পযন্ত হাত ধৗত করলে উপরিউক্ত তিনটি অঙ্গে শক্তি সঞ্চার করে।

মাথা মাসাহ্ করাঃ 

একজন ব্যক্তি ফ্রান্সে থাকা অবস্থায় একদিন নামাজের জন্য ওজু করছিলেন। আরেক জন ব্যক্তি তা অবাক হয়ে দেখছিলেন।যিনি ওযু করছিলেন তার ওযু শেষ হলে অপর ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কে? তখন ওই ব্যক্তি বলেন আমি মুসলমান।অপর ব্যক্তি বললেন তুমি কোথা থেকে এসেছো? তখন উক্ত ব্যক্তি একটি মুসলিম দেশের কথা বললেন।অপর ব্যক্তি সেই মুসলিমকে প্রশ্ন করলেন তোমার দেশের মানসিক হাসপাতাল কয়টি? মুসলিম ব্যক্তি বললেন ২/৪ টি এব্যাপারে আমার কোন ধারনা নাই।তখন অপর ব্যাক্তি একথা শুনে বল্লেন, আমাদের দেশে অনেক মানসিক হাসপাতাল রয়েছে। আমি একজন হাসপাতালের সার্জন। আমি অনেক দিন যাবৎ অনুসন্ধান করছি মানুষের পাগল হওযার কারন। আমার গবেষনা অনুযায়ী এর কারন হল,মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় সক্রিয় থাকে এবং মস্তিষ্কের সিগন্যাল অনুযায়ী শরীরে প্রত্যেক অঙ্গ কাজ করে,তাই অতিরিক্ত চিন্তা থেকে মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় কার্য ক্ষমতায় বাধা প্রাপ্ত হয়,এথেকেই মানুষের পাগল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিনি আরো বলেন,মানুষের চুল বড় রাখলে বা মাথার পৃষ্ট শুষ্ক থাকলে সেই স্থানের শিরার মধ্যে শুষ্কতার সৃষ্টি হয় যা শরীরে প্রভাব ফেলে। তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে মাথা মাসাহ্ করার স্থান প্রত্যহ ২/৪ বার মাসাহ করে উক্ত স্থান ভিজালে এতে শিরা গুলোর কার্য ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।এতে মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে।তাছাড়া মাসাহ্ করার ফলে ঘাড়ে বাতাস লাগে যা সানস্ট্রোক থেকে রক্ষা করে।

পা ধৌত করাঃ 

অনেক মানুষ আছেন যারা কাজের চাপে তাদের জুতা খুলতেই ভুলে যান।এর ফলে ফাঙ্গাস ইনফেকশন,ডাইবেটিস,জন্ডিস,মানসিক অবসাধ সহ আরো অনেক সমস্যা হতে পারে। কিন্তু একজন ব্যাক্তি যদি প্রত্যহ ৫ বার ওযু করতে পাঁয়ে পানি দিয়ে পাঁ ভিজায় তাবে ওই সকল সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

ওযুর ফরজ কয়টি

ইসলামের বিধান অনুসারে ওযু হল দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের একটি পন্থা। নামাজের পূ্র্বে অবশ্যই ওযু করতে হয়। আল্লাহ তাআলা বান্দার নামাজ আদায়ের জন্য ওযুকে করেছেন ফরজ। বিনা ওযুতে ফরজ ইবাদত করা পাপের কাজ। ওযুতে মোট চারটি ফরজ বা অবশ্য করণীয় কাজ রয়েছে। যা না করলে ওযু হবে না।

  • সমস্ত মুখ ভালভাবে ধৌত করা।
  • দুই হাতের কনুইসহ ভালভাবে ধৌত করা।
  • মাথা চার ভাগের এক ভাগ মাসেহ্ করা।
  • দুই পায়ের টাকনুসহ ধৌত করা।

ওযুর সুন্নত 

ওযু দৈহিক পবিত্রতার অন্যতম মাধ্যম। ইসলামের প্রধান ইবাদত নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ওযু করা শর্ত। ওযু  কীভাবে করতে হয়, তা মহানবী (সা.) সাহাবিদের শিখিয়ে গেছেন। কোরআনে বর্ণিত ফরজগুলোর বাইরে মহানবী (সা.)-এর শেখানো নিয়মগুলোই ওযুর সুন্নত।

  • ওযুর শুরুতে নিয়ত করা। (বুখারি)
  • বিসমিল্লাহ পড়া। (আবু দাউদ)
  • উভয় হাত কবজি পর্যন্ত ধোয়া। (মুসলিম)
  • মিসওয়াক করা। (আবু দাউদ)
  • কুলি করা। (মুসলিম)
  • নাকে পানি দেওয়া। (মুসলিম)
  • রোজাদার না হলে ভালোভাবে কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়া। (তিরমিজি)
  • প্রতিটি অঙ্গ তিনবার ধোয়া। (মুসলিম)
  • দাড়ি খিলাল করা। (আবু দাউদ)
  • আঙুলসমূহ খিলাল করা। (তিরমিজি)
  • পুরো মাথা মাসেহ করা। (আবু দাউদ)
  • উভয় কানের ভেতরে ও বাইরে মাসেহ করা। (আবু দাউদ)
  • মাথার সামনের অংশ থেকে মাসেহ শুরু করা। (মুসলিম)
  • গর্দান মাসেহ করা। (কানজুল উম্মাল)
  • ধোয়ার সময় অঙ্গগুলোকে ঘষেমেজে ধোয়া। (আবু দাউদ)
  • একটি অঙ্গ শুকানোর আগেই পরের অঙ্গ ধোয়া। (বুখারি)
  • অঙ্গগুলো ধোয়ার সময় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। অর্থাৎ প্রথমে মুখমণ্ডল, তারপর হাত ধোয়া, এরপর মাথা মাসেহ করা এবং পা ধোয়া। (সুরা মায়েদা: ৬)
  • বাঁ হাত দিয়ে প্রথমে ডান হাত ধোয়া এবং বাঁ হাত দিয়ে প্রথমে ডান পা ধোয়া। (নাসায়ি)

ওযুর আদব

বিসমিল্লাহ বলে ওযু শুরু করা : 

ওযুর শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে। রাসূল (সাঃ) বলেন, وَلاَ وُضُوْءَ لِمَنْ لَمْ يَذْكُرِ اسْمَ اللهِ تَعَالَى عَلَيْهِ. ‘ঐ ব্যক্তির ওযু হয় না যে তাতে আল্লাহর নাম নেয় না’।

মিসওয়াক করা : 

ওযু করার পূর্বে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব। কেননা এটা মুখের পরিচ্ছন্নতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। রাসূল (সাঃ) বলেন, السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ ‘মেসওয়াক মুখের পবিত্রতা অর্জনের উপায় ও আল্লাহর সন্তোষ লাভের মাধ্যম’। তিনি আরো বলেছেন,لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِى لأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلاَةٍ ‘আমার উম্মাতের উপর কষ্টকর না হ’লে অবশ্যই আমি তাদেরকে প্রত্যেক সালাতের পূর্বে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম’।

পূর্ণরূপে ওযু করা : 

সঠিকভাবে ও পূর্ণাঙ্গরূপে ওযু করা জরুরি। কেননা ওযুর উপরেই সালাত নির্ভর করে। হাদি সে এসেছে, 

عَنْ نُعَيْمِ بْنِ عَبْدِ اللهِ الْمُجْمِرِ قَالَ رَأَيْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ يَتَوَضَّأُ فَغَسَلَ وَجْهَهُ فَأَسْبَغَ الْوُضُوءَ ثُمَّ غَسَلَ يَدَهُ الْيُمْنَى حَتَّى أَشْرَعَ فِى الْعَضُدِ ثُمَّ يَدَهُ الْيُسْرَى حَتَّى أَشْرَعَ فِى الْعَضُدِ ثُمَّ مَسَحَ رَأْسَهُ ثُمَّ غَسَلَ رِجْلَهُ الْيُمْنَى حَتَّى أَشْرَعَ فِى السَّاقِ ثُمَّ غَسَلَ رِجْلَهُ الْيُسْرَى حَتَّى أَشْرَعَ فِى السَّاقِ ثُمَّ قَالَ هَكَذَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ. وَقَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَنْتُمُ الْغُرُّ الْمُحَجَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ إِسْبَاغِ الْوُضُوءِ فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ فَلْيُطِلْ غُرَّتَهُ وَتَحْجِيلَهُ.

 নু‘আয়ম ইবনু আব্দুল্লাহ আল-মুজমির (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)-কে ওযু করতে দেখেছি। তিনি মুখমন্ডল ধৌত করলেন এবং উত্তমরূপে ওযু করলেন। এরপর তিনি ডান হাত বাহুর কিছু অংশ সহ ধৌত করলেন। পরে বাম হাত ও বাহুর কিছু অংশসহ ধৌত করলেন। এরপর মাথা মাসাহ করলেন।  অতঃপর ডান পায়ের নলার কিছু অংশসহ ধৌত করলেন, এরপর বাম পায়ের নলার কিছু অংশসহ ধৌত করলেন। অতঃপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে এভাবে ওযু করতে দেখেছি। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘পূর্ণাঙ্গরূপে ওযু করার কারণে কিয়ামতের দিন তোমাদের মুখমন্ডল, হাত ও পায়ের ওযুর স্থান সমূহ উজ্জ্বল হবে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা সক্ষম তারা যেন নিজ নিজ মুখমন্ডল, হাত ও পায়ের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে নেয়’।

পানি অপচয় না করা : 

ওযু করার জন্য প্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নবী করীম (সাঃ) সাধারণতঃ এক ‘মুদ্দ’ বা ৬২৫ গ্রাম পানি দিয়ে ওযু করতেন’।

কব্জিসহ দু’হাত ধৌত করা : 

ওযুর পূর্বে দু’হাত কব্জিসহ ধৌত করা সুন্নাত। আমর ইবনু আবূ হাসান (রহঃ) হ’তে বর্ণিত,

سَأَلَ َعَبْدَ اللهِ بْنَ زَيْدٍ عَنْ وُضُوْءِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَدَعَا بِتَوْرٍ مِنْ مَاءٍ، فَتَوَضَّأَ لَهُمْ وُضُوْءَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَأَكْفَأَ عَلَى يَدِهِ مِنَ التَّوْرِ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ ثَلاَثًا،

‘তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ (রাঃ)-কে নবী করীম (সাঃ)-এর ওযু সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি এক পাত্র পানি আনলেন এবং তাঁদের (দেখাবার) জন্য নবী করীম (সাঃ)-এর মত ওযু করলেন। তিনি পাত্র থেকে দু’হাতে পানি ঢাললেন। তা দিয়ে হাত দুটি তিনবার ধৌত করলেন’।

এক হাতে পানি নিয়ে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া : 

এক কোষ পানি নিয়ে কুলি করা ও নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়া সুন্নাত। আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ (রাঃ) নবী করীম (সাঃ)-এর ওযু সম্পর্কে বলেন, ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِى التَّوْرِ، فَمَضْمَضَ  وَاسْتَنْشَقَ وَاسْتَنْثَرَ ثَلاَثَ غَرَفَاتٍ، ‘অতঃপর পাত্রের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তিন কোষ পানি নিয়ে কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়লেন’। তবে প্রয়োজনে নতুন পানি নিয়ে নাকে দিয়ে বাম হাতে ভালভাবে নাক ঝাড়া যাবে।

হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলি খিলাল করা :

হাত-পায়ের আঙ্গুলগুলি খিলাল করা সুন্নাত। রাসূল (সাঃ) বলেন, إِذَا تَوَضَّأْتَ فَخَلِّلِ الأَصَابِعَ ‘যখন তুমি ওযু করবে তখন আঙ্গুলগুলো খিলাল করবে’। অন্যত্র তিনি বলেন,إذَا تَوَضَّأتَ فَخَلِّلْ أّصَابِعَ يَدَيْكَ وَرِجْلَيْكَ، ‘যখন তুমি ওযু করবে, তখন তোমার হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলো খিলাল করবে’।

নাকে পূর্ণরূপে পানি পৌঁছানো : 

ওযু করার সময় নাকে পূর্ণরূপে পানি প্রবেশ করানো সুন্নাত। রাসূল (সাঃ) বলেন,أَسْبِغِ   الْوُضُوْءَ وَخَلِّلْ بَيْنَ الأَصَابِعِ وَبَالِغْ فِى الاِسْتِنْشَاقِ إِلاَّ أَنْ تَكُوْنَ صَائِمًا، ‘ভালোভাবে ওযু কর, আঙ্গুলগুলোর মাঝে খিলাল কর এবং সিয়াম পালনকারী না হলে নাকের গভীরে পানি পৌঁছাও। 

ঘন দাড়ি খিলাল করা : 

কারো দাড়ি ঘন থাকলে খিলাল করে সেখানে পানি প্রবেশ করানো জরুরি। আনাস (রাঃ) বলেন,كَانَ إِذَا تَوَضَّأَ أَخَذَ كَفًّا مِنْ مَاءٍ فَأَدْخَلَهُ تَحْتَ حَنَكِهِ فَخَلَّلَ بِهِ لِحْيَتَهُ وَقَالَ هَكَذَا أَمَرَنِى رَبِّى عَزَّ وَجَلَّ، ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ওযু করার সময় হাতে এক কোষ পানি নিতেন। তারপর ঐ পানি চোয়ালের নিম্নদেশে (থুতনির নীচে) লাগিয়ে দাড়ি খিলাল করতেন এবং বলতেন, আমার মহান প্রতিপালক আমাকে এরূপ করারই নির্দেশ দিয়েছেন’। 

ওযু শেষে লজ্জাস্থানে বরাবর পানি ছিটানো : 

ওযু করার পরে লজ্জাস্থানে বরাবর পানি ছিটিয়ে দেওয়া মুস্তাহাব। হাকাম অথবা ইবনু হাকাম হ’তে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত,أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَالَ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَنَضَحَ فَرْجَهُ. ‘একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পেশাব করলেন। অতঃপর ওযু করে স্বীয় লজ্জাস্থানে পানি ছিটিয়ে দিলেন’।

ওযুর হেফাযত করা : 

পরিপূর্ণরূপে ওযু করার মাধ্যমে ওযুর হেফাযত করা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,اسْتَقِيمُوْا وَلَنْ تُحْصُوْا وَاعْلَمُوْا أَنَّ خَيْرَ أَعْمَالِكُمُ الصَّلاَةُ وَلاَ يُحَافِظُ عَلَى الْوُضُوْءِ إِلاَّ مُؤْمِنٌ. ‘তোমরা (দ্বীনের উপর) অবিচল থাকো, যদিও তোমরা আয়ত্তে রাখতে পারবে না। জেনে রাখো, তোমাদের আমল সমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হল সালাত। কেবল মুমিন ব্যক্তিই যত্ন সহকারে ওযু করে’।

ওযুর পরে দোয়া করা : 

ওযু করার পরে দোয়া করা সুন্নাত। ওযুর পরে দোয়া করলে জান্নাতের আটটি দরজার যে কোনটি দিয়ে প্রবেশ করা যাবে। রাসূল (সাঃ) বলেন,مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ الْوُضُوءَ ثُمَّ يَقُولُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ ثَمَانِيَةُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ. ‘পরিপূর্ণরূপে ওযু করে যে ব্যক্তি এই দোয়া পাঠ করবে, ‘আশহাদু আল লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ’। অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে, যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা তাতে প্রবেশ করবে’।

ওযুর পরে দুই রাকাত  সালাত আদায় করা :

ওযু করার পর দুই রাকাত সালাত আদায় করা মুস্তাহাব। রাসূল (সাঃ) বলেন,مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ وُضُوْءَهُ ثُمَّ يَقُوْمُ فَيُصَلِّى رَكْعَتَيْنِ مُقْبِلٌ عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ إِلاَّ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ- ‘যে কোন মুসলিম যখনই সুন্দরভাবে ওযু করে দাঁড়িয়ে একাগ্রতার সাথে দুই রাকাত সালাত আদায় করে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়’।

ধাপে ধাপে ওযু করার নিয়ম

নিয়ত ও বিসমিল্লাহ:

‘বিসমিল্লাহ’ বলে এবং মনে মনে পবিত্রতার নিয়ত করে ওযু শুরু করুন।

হাত ধোয়া: 

কবজি পর্যন্ত উভয় হাত তিনবার ধুয়ে নিন, আঙুলগুলো ভালোভাবে খিলাল করুন।

কুলি করা: 

ডান হাতে পানি নিয়ে তিনবার কুলি করুন।

নাক পরিষ্কার: 

ডান হাতে পানি নিয়ে তিনবার নাকে পানি দিয়ে বাম হাত দিয়ে নাক পরিষ্কার করুন।

মুখমণ্ডল ধোয়া: 

কপাল থেকে থুতনি পর্যন্ত এবং এক কানের লতি থেকে অপর কানের লতি পর্যন্ত সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল তিনবার ধুয়ে নিন।

হাত ধোয়া: 

প্রথমে ডান হাত ও পরে বাম হাত কনুইসহ তিনবার ভালো করে ধুয়ে নিন।

মাথা মাসেহ: 

ভেজা হাত দিয়ে একবার পুরো মাথা মাসেহ করুন।

কান ও ঘাড়:

কানের ভেতরের অংশ শাহাদাত আঙুল দিয়ে এবং পেছনের অংশ বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে মাসেহ করুন। এরপর ঘাড় মাসেহ করুন।

পা ধোয়া: 

ডান পা ও পরে বাম পা টাখনুসহ (গোড়ালি) তিনবার ধুয়ে নিন এবং পায়ের আঙুলগুলো খিলাল করুন।

ওযু ভঙ্গের কারণসমূহ

মৌলিকভাবে ওযু ভঙ্গের কারণ ৭টি।

  • পায়খানা ও পেশাবের রাস্তা দিয়ে কোনো কিছু বের হওয়া
  • রক্ত, পূঁজ, বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়া
  • মুখ ভরে বমি করা
  • থুথুর সঙ্গে রক্তের ভাগ সমান বা বেশি হওয়া
  • চিৎ বা কাত হয়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া
  • মাতাল বা অচেতন হলে
  • নামাজে উচ্চস্বরে হাসি দিলে

ওযুতে সাধারণ ভুল

  • বিসমিল্লাহ্‌ বলতে ভুলে যাওয়া 
  • মেসওয়াক না করা
  • সঠিক ভাবে কুলি না করা
  • নাকে পানি দেওয়ার পদ্ধতিতে ভুল করা
  • নাক ঝাড়তে ভুলে যাওয়া
  • আঙ্গুলের ফাঁকে পানি না পৌঁছানো
  • শরীরের কোনো অংশ শুকনো থাকা

FAQ

প্রশ্নঃ ওযু করার সঠিক নিয়ম কী?

উত্তরঃ প্রথমে নিয়ত করতে হবে। তারপর “বিসমিল্লাহ” বলে দুই হাত ধোয়া, কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া, মুখ ধোয়া, দুই হাত কনুইসহ ধোয়া, মাথা মাসেহ করা এবং শেষে দুই পা টাখনুসহ ধুতে হবে।

প্রশ্নঃ কোন কোন কারণে ওযু ভেঙে যায়?

উত্তরঃ প্রস্রাব বা পায়খানা হওয়া, বায়ু বের হওয়া, গভীর ঘুম, বমি করা বা অচেতন হয়ে গেলে ওযু ভেঙে যায়।

প্রশ্নঃ এক ওযু দিয়ে কি একাধিক নামাজ পড়া যায়?

উত্তরঃ হ্যাঁ। ওযু না ভাঙা পর্যন্ত এক ওযু দিয়েই একাধিক ফরজ ও নফল নামাজ পড়া যায়।

প্রশ্নঃ গোসল করলে কি ওযু হয়ে যায়?

উত্তরঃ ফরজ গোসল (যেমন- স্বপ্নদোষ, সহবাস, বা ঋতুস্রাব শেষে) করার সময় যদি কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া ও পুরো শরীর ভালোভাবে ধৌত করার ফরজ কাজগুলো আদায় করা হয়, তবে আলাদা করে ওযু করার প্রয়োজন নেই।

প্রশ্নঃ নেইল পলিশ থাকলে কি ওযু হবে?

উত্তরঃ না। নেইল পলিশ পানিকে নখে পৌঁছাতে বাধা দেয়, তাই আগে তা তুলে তারপর ওযু করতে হবে।

প্রশ্নঃ ঘুমালে কি ওযু ভেঙে যায়?

উত্তরঃ গভীর ঘুম হলে ওযু ভেঙে যায়। তবে হালকা ঘুমে সাধারণত ওযু ভাঙে না।

প্রশ্নঃ ওযু না করে কি নামাজ পড়া যাবে?

উত্তরঃ না। ওযু ছাড়া নামাজ সহিহ হয় না।

প্রশ্নঃ ওযু করতে কতবার অঙ্গ ধোয়া উচিত?

উত্তরঃ প্রতিটি অঙ্গ ৩ বার করে ধোয়া উচিত। 

প্রশ্নঃ ওযু ভেঙেছে কিনা সন্দেহ হলে কী করবো?

উত্তরঃ শুধু সন্দেহ হলে ওযু ভাঙে না। নিশ্চিত হলে তবেই নতুন করে ওযু করতে হবে।

প্রশ্নঃ ওযুতে নিয়ত করা কি জরুরি?

উত্তরঃ নিয়ত করা সুন্নত। মনে মনে ওযু করার ইচ্ছা থাকলেই নিয়ত হয়ে যায়।

প্রশ্নঃ ওযুর সময় নখ কাটা বা পরিষ্কার করা কি জরুরি?

উত্তরঃ জরুরি নয়। তবে নখ পরিষ্কার থাকা ভালো যাতে পানির প্রবাহে বাধা না হয়।

প্রশ্ন: ওযু ভেঙে গেলে কী করতে হবে?

উত্তরঃ ওযু ভেঙে গেলে নামাজ পড়ার আগে আবার নতুন করে ওযু করতে হবে। কারণ ওযু ছাড়া নামাজ সহিহ হয় না।